বাংলাদেশের তরুণদের নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা তরুণরাই হয়ে উঠছে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণ ,সাইফ উল আলম

0
81

বর্তমানে সঠিক নির্দেশনা ও উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে আমাদের দেশের তরুণরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, বিপথে যাচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে অসামাজিক ও অনৈতিক কর্মকান্ডে। ফলে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর কারণে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের (জনসংখ্যার লভ্যাংশ) কথা বলা হলেও দেশের সমাজ ও অর্থনীতির জন্য তারা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের তরুণদের নিয়ে একাধিক গবেষণা করেছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান। ওইসব গবেষণায় দেশের তরুণদের বিষয়ে এমন চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। আর বৈশ্বিক পরিম-লে উচ্চশিক্ষার মানের দিক দিয়ে ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক এমএ মান্নান এ প্রসঙ্গে বলেন, স্বাধীনতার পর তিন দশকের বেশি সময় উচ্চশিক্ষা তেমন গুরুত্ব পায়নি। এ কারণে একটা বড় সময় ধরে অবহেলিত ছিল দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। মানে পিছিয়ে পড়ার এটি একটি কারণ হতে পারে। এছাড়া গত দুই দশকে এ খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। অর্থ বরাদ্দ কম থাকার ফলে পরিধি বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি।
২০১৫ সালে ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ ইন্টেগ্রিটি সার্ভে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), যেখানে তরুণদের সততার বিষয়টি উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেয়া ৯৮ শতাংশ তরুণই মনে করে, সমাজে সততার ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সততা-বিষয়ক শিক্ষা না পাওয়ার কথা জানিয়েছে জরিপে অংশ নেয়া ৬২ শতাংশ তরুণ।
২০১৪ সালের জুনে ‘লেবার মার্কেট ট্রানজিশনস অব ইয়াং উইমেন অ্যান্ড মেন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও মাস্টারকার্ড ফাউন্ডেশন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য বিমোচন- সর্বক্ষেত্রেই বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে আছে। যদিও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোনো শোভন কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারণে কাজে লাগেনি। কর্মসংস্থানের সুযোগের এ ঘাটতির প্রভাবে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে তরুণদের বড় একটি অংশ।
শিক্ষার সুযোগের অপ্রতুলতাও উঠে এসেছে গবেষণায়। দেখা গেছে, তরুণদের ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা সম্পন্ন করছে। তবে স্কুল পর্যায়ে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
ওই গবেষণায় আরো বলা হয়, কাজের পেছনে ছুটতে গিয়েই স্কুল পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়ে তরুণরা। ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ তরুণ তাদের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করে না। অর্থাৎ তরুণদের একটি বড় অংশ কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।
তরুণদের বড় একটি অংশ নিষ্ক্রিয়, যার হার ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ। নিষ্ক্রিয়দের মধ্যে আবার বড় অংশ নারী। এরা কেউ শ্রমবাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তরুণদের মধ্যে যারা বেকার, তাদের আর্থিক সক্ষমতার তথ্যও উঠে এসেছে গবেষণায়। তাতে দেখা গেছে, ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেকার যুবক অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. তানিয়া রহমান বলেন, “এ প্রজন্মকে আমরা সুশিক্ষা দিতে পারছি না, ব্যস্ততার কারণে পরিবারের সদস্যরাও এদের ঠিকমতো সময় দিচ্ছেন না। ফলে এরা নিঃসঙ্গতায় দিন কাটায়। এমন অবস্থায় সঠিক নির্দেশনার অভাবে তরুণ প্রজন্ম বিপথে পা বাড়ায়।”
যুব সমাজ নিয়ে ‘নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ ২০১৫ অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক গবেষণা করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইড, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস। এ গবেষণায় অধিকাংশ তরুণই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে একটি অংশ উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পর্কেও মতামত জানিয়েছে।
এ গবেষণায় তরুণদের নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ার কারণও প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, নেশাগ্রস্ত তরুণদের ৬৮ শতাংশ এ পথে যাচ্ছে মজার ছলে, ১৯ শতাংশ যায় কৌতূহলবশত আর সঙ্গী বা বন্ধুত্বের চাপে নেশাগ্রস্ত হয় ১৮ শতাংশ তরুণ। পারিবারিক বা প্রণয়জনিত কারণে ৯ শতাংশ ও বড়দের চাপে নেশায় আচ্ছন্ন হয় ৩ শতাংশ।
গবেষণাটিতে তরুণদের সহিংস কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমেই আছে বেকারত্ব। দেখা গেছে, তরুণদের ৬৯ শতাংশ বেকারত্বের কারণে সহিংস কর্মকান্ডে যুক্ত হচ্ছে। ৫৪ শতাংশ হচ্ছে দারিদ্র্যের কারণে, ৩০ শতাংশ টাকার চাহিদায়, ২৯ শতাংশ বন্ধুত্বের চাপে ও ২২ শতাংশ রাজনৈতিক চাপে সহিংসতায় যুক্ত করছে নিজেকে।
২০১২ সালে ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ সার্ভে’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, সুইজারল্যান্ডের উন্নয়ন সংস্থা এসডিসি ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সেই গবেষণায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তরুণদের বঞ্চিত দশা ফুটে উঠেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যুবসমাজের সামনে কোনো আদর্শ নেই, যার প্রভাবে তরুণ তার নিজ উন্নয়নে লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি দেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিয়েও তাদের মধ্যে মতামত তৈরি হচ্ছে। নির্বাচিত নেতা ও পুলিশ প্রশাসনকে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করে যুবসমাজ।
আলোচ্য গবেষণাটিতে তরুণরা তাদের অবসর কীভাবে কাটাচ্ছে, তারও চিত্র সামনে আনা হয়েছে। দেখা গেছে, দেশে অবসর সময় কাটানোর ক্ষেত্রে যুবসম্প্রদায়ের বেশির ভাগেরই অগ্রাধিকার পাওয়া বিষয় হলো ধর্ম ও উপন্যাস পড়া। ৮০ শতাংশের বেশি মুসলমান তরুণ হিজাব পরিধানকে গুরুত্ব দেয়।
‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ উন্নয়নে দেশের তরুণদের মধ্যে মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে গবেষণায়। সেলফোনের ব্যবহার তরুণদের মধ্যে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি এর সঠিক ব্যবহার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখছে না। তাদের ওপর অনেক বিষয় চাপিয়ে দেয়া হয়। এতে তরুণদের মাঝে ভালো-মন্দ বিচারের সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে না। সন্তানকে সঠিক পথে রাখতে হলে অবশ্যই তাকে স্বাধীন করে বেড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি তাদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। যুবসম্প্রদায় যেসব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে, তার মধ্যে প্রথমেই আছে শিক্ষার মান। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কর্মসংস্থানের সুযোগ।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী আখতার উদ্দিন আহমেদ বলেন, মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে যুব উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এগুলো আরো কার্যকর করারও পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু আত্মকর্মসংস্থানের জন্য নয়, সার্বিকভাবেও জীবন গঠনের আদর্শের ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে তরুণরা। এক্ষেত্রে শিক্ষা ও সংস্কৃতিও অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এখন জিপিএ অর্জনের চাপে খেলাধুলাসহ সাংস্কৃতিক মনোভাব তৈরি হওয়া দুরূহ হয়ে পরেছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আদর্শ প্রকল্প ও খেলাধুলা চর্চার বড় পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সম্মিলিত কার্যক্রমই কর্মোদৌমি তরুণসমাজ গঠনে তথা দেশের উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাইফ উল আলম : নিজস্ব প্রতিবেদক, শেয়ার বিজ।
saiful_cu_eco@yahoo.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here